স্থানীয় বাজারের ৯৮ শতাংশ ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও কাঁচামালে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ। অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) আমদানিতে বছরে শতকোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এ নির্ভরতা কমাতে চীন ও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবার এপিআই শিল্পে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে ‘এপিআই শিল্পের উন্নয়নে নীতি ও বাস্তবায়ন কৌশল’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব মতামত তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। সভার আয়োজন করে অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ (এএইচআরবি)।
সভাটি সঞ্চালনা করেন বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও এএইচআরবির আহ্বায়ক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ।
সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়লে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা আরো স্থিতিশীল হবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে। এপিআই শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, স্বল্প সুদের ঋণ ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালুর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ভারত ও চীনের মতো বাংলাদেশেও এ খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।’
পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক মান রক্ষায় কমপ্লায়েন্স গ্রান্ট চালুরও সুপারিশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদি বলেন, ‘সরকার ২০১৭ সালের পর থেকে ওষুধের দাম সমন্বয় না করায় প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। এপিআই শিল্প এখন দুটি বড় সংকটে—জ্বালানির ঘাটতি এবং সলভেন্ট ইন্টারমিডিয়েটের অনুমোদনে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এপিআই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে, শুধু কমিটি গঠন করে হবে না। আমাদের দেশে এপিআইয়ের কাঁচামাল এখনো চীন ও ভারত থেকে আসে। কিন্তু সেখানে এমন দামের ম্যাটারিয়াল আনা সম্ভব নয়, যাতে আমরা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারি। সরকার যদি নীতিগতভাবে সাপোর্ট না দেয়, তাহলে এ শিল্প কখনই টেকসই হবে না। এপিআই পার্কে জমির দাম আমরা পরিশোধ করেছি, কিন্তু সে টাকার কোনো রিটার্ন পাচ্ছি না। ২০১৮ সালে প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও বলা হচ্ছে ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ সংযোগ আসবে। সরকারের পক্ষ থেকে জমির দাম ও ইন্টারেস্ট নেয়া হলেও অবকাঠামোগত সুবিধা এখনো অনিশ্চিত।’
সভায় ওষুধের কাঁচামাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মোর্চা বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) সভাপতি সাইফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ভারত ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। তাদের এপিআই শিল্প সম্প্রসারণের কৌশল ভালোভাবে বোঝা দরকার। ভারত তাদের এপিআই শিল্প সম্প্রসারণের স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করেছে। তাদের মতো আমাদের দেশে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।’
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ‘সরকারের উৎসাহে ৪৯০ কোটি টাকা লোন নিয়ে দুই বছর আগে এপিআই পার্কে কারখানা স্থাপন করেছি। এখন প্রতিদিন ২০ লাখ টাকা সুদ দিতে হচ্ছে। তবে এখন সরকার থেকে বলছে, গ্যাস পাওয়া যাবে না। এ অবস্থায় আমার পর আর কেউ এখানে এপিআই পার্ক করতে আসবে না।’